০৯:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মৃত্যুর চিন্তা আল্লাহভীরুতা আনয়ন করে ও ঈমান বৃদ্ধি করে

  • ইসলামী ডেক্স
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৩:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ মে ২০২৩
  • ৮০ দেখেছেন

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। যিনি সমস্ত বিশ্বজগতের সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, লালনকর্তা ও পালনকর্তা। আল্লাহ সমুদয় বস্তুর মালিক ও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। সত্তা, স্বকীয়তা, গুণ, কর্ম ও ক্ষমতায় তাঁর সমপর্যায়ের কেউই নেই, তিনি লা শরিক। দৃশ্য ও অদৃশ্য জগতের সব কিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই মানবকে জীবন দিয়েছেন; মরণও তাঁরই ইচ্ছাধীন। তিনিই জীবন ও মরণের মালিক। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, প্রাচুর্যময় তিনি (আল্লাহ) যাঁর হাতে রাজ্যের ক্ষমতা, তিনি সব বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান। যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে পরীক্ষা করবেন তোমাদের, কে তোমাদের কর্মে উত্তম। তিনি পরাক্রমশালী স্নেহশীল ক্ষমায়। (সুরা মুলক, আয়াত ১-২)

প্রত্যেক প্রাণী মাত্রই মরণশীল। জন্ম ও মৃত্যু অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। দুটির কোনটির ক্ষমতা মানুষের হাতে নেই। আল্লাহর হুকুমেই জন্ম হয়। আল্লাহর হুকুমেই মৃত্যু হয়। কখন হবে, কোথায় হবে, কিভাবে হবে, তা কারো জানা নেই। আল্লাহর হাতেই সবকিছু, যিনি জীবন দান করেছেন। অতঃপর জীবনদাতার সামনে হাজিরা দিয়ে জীবনের পূর্ণ হিসাব পেশ করতে হবে। হিসাব শেষে জান্নাত বা জাহান্নাম নির্ধারিত হবে ও সেখানেই চিরকাল শান্তিতে বাস করবে অথবা শাস্তি ভোগ করবে।

আল্লাহতায়ালা বলেন, প্রতিটি প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে। মহাবিচার দিবসে তোমাদের সবাইকে কর্মফল পুরোপুরিই দেয়া হবে। সফল মানুষ হবে সে-ই, যাকে লেলিহান আগুন থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে দাখিল করা হবে। আর শুধু পার্থিব জীবন তো এক মরীচিকাপূর্ণ ভোগ-বিভ্রম ছাড়া কিছুই নয়।’ (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৮৫)

আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা কীভাবে আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার কর? অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন। তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন ও পুনরায় জীবন্ত করবেন। পরিণামে তার দিকেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে। তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং তাকে সপ্ত আকাশে বিন্যস্ত করেন। তিনি সর্ববিষয়ে সবিশেষ অবগত। (সুরা বাকারা, আয়াত ২৮-২৯)

পবিত্র কোরআন শতাব্দীর পর শতাব্দী জীবন ও জগৎ সম্পর্কে কোটি কোটি মানুষের অন্তর্দৃষ্টি খুলে দিয়েছে, বদলে দিয়েছে ভেতর থেকে, খুলে দিয়েছে তাদের সম্ভাবনার দ্বার, দিয়েছে প্রশান্ত ও পরিতৃপ্ত জীবন। এই জীবনের সঙ্গে মৃত্যুও যে জড়িত তাও আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহই তোমাদের জীবন দান করেছেন। তিনিই তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন। আবার তিনিই তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করবেন। তারপরও মানুষ অতি-অকৃতজ্ঞ! (সুরা হজ, আয়াত ৬৬)

নিশ্চয়ই কখন কেয়ামত হবে তা শুধু আল্লাহই জানেন। তিনি মেঘ থেকে বৃষ্টিবর্ষণ করেন। তিনি জানেন জরায়ুতে কী আছে। অথচ কেউই জানে না আগামীকাল তার জন্যে কী অপেক্ষা করছে এবং কেউ জানে না কোথায় তার মৃত্যু হবে। শুধু আল্লাহই সর্বজ্ঞ, সব বিষয়ে অবহিত।’ (সূরা লোকমান, আয়াত ৩৪)

দূরাচারীরা কি মনে করে যে, তাদের জীবন ও মৃত্যু এবং বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীলদের জীবন ও মৃত্যু একইরকম হবে? কত ভ্রান্ত ধারণা ওদের! (সুরা জাসিয়া, আয়াত ২১)

নিশ্চয়ই মৃত্যুর সময় নির্ধারিত। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো মৃত্যু হতে পারে না। কেউ পার্থিব পুরস্কারের জন্যে কাজ করলে তাকে তার পুরস্কার ইহকালে দান করবো। আর যদি কেউ পরকালের জন্যে কাজ করে তবে তার পুরস্কার সে পরকালে পাবে। শোকরগোজার বান্দাদের কাজের ফল আমি নিশ্চয়ই দেবো। (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৪৫)

সত্যের পথে তোমরা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করো বা নিহত হও, তোমরা আল্লাহর কাছেই সমবেত হবে। (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৫৮)

‘হে নবী! তোমার পূর্বেও আমি কোনো মানুষকে অমরত্ব দান করিনি। তোমার মৃত্যু হলে ওরা কি চিরকাল বেঁচে থাকবে?’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত ৩৪)

‘প্রত্যেক প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আমি তোমাদের ভালো ও খারাপ অবস্থা দিয়ে পরীক্ষা করি। আর আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসতে হবে।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত ৩৫)

‘আল্লাহ মৃত্যু এলে বা ঘুমের সময় আত্মাকে তুলে নেন। তারপর যার মৃত্যু অবধারিত তার আত্মা রেখে দেন। আর অন্যদের আত্মা নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ফিরিয়ে দেন। সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগকারীদের জন্যে এর মধ্যে শিক্ষণীয় নিদর্শন রয়েছে!’ (সুরা জুমার, আয়াত ৪২)

‘হে মানুষ! আমিই জীবন দান করি। আমিই মৃত্যু ঘটাই। আমার কাছেই সবাইকে ফিরে আসতে হবে। যেদিন জমিন বিদীর্ণ হবে এবং মৃত্যুরা উত্থিত হয়ে ছুটতে থাকবে, তখন তাদের সমবেত করা খুব সহজ একটি কাজ।’ (সুরা কাফ, আয়াত ৪৩-৪৪)

‘আমি বিধান দিয়েছি যে, মৃত্যু সব সময় তোমাদের মাঝে অবস্থান করবে। আর তোমাদের অস্তিত্বের প্রকৃতি পরিবর্তন বা তোমাদের জানা নেই, এমন আকৃতিতে তোমাদের সৃষ্টি করা থেকে আমাকে বিরত রাখার শক্তি কারো নেই।’ (সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত ৬০-৬১)

‘হে নবী ওদের বলুন, যে মৃত্যু থেকে তোমরা পালাতে চাচ্ছ, তোমাদেরকে সে মৃত্যুর মুখোমুখি হতেই হবে। শেষ পর্যন্ত তোমাদেরকে হাজির করা হবে দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর কাছে। জীবদ্দশায় যা করেছ, তা তোমরা তখন পুরোপুরি জানতে ও উপলব্ধি করতে পারবে।’ (সুরা জুমআ, আয়াত ৮)

‘সারাজীবন অন্যায় করে মৃত্যু শয্যায় এসে যারা বলে, আমি তওবা করলাম, তাদের তওবা কোন কাজে আসবে না। আর সত্য অস্বীকারকারী হিসেবেই যারা মৃত্যুবরণ করে, তাদের জন্যেও তওবা নয়। তাদের জন্যে আমি নিদারুণ শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছি।’ (সুরা নিসা, আয়াত ১৮)

‘যারা মুক্তমন নিয়ে শোনে, তারাই সত্যের ডাকে সাড়া দেয়। মহাবিচার দিবসে আল্লাহ মৃতদের পুনর্জীবিত করবেন। তারপর তারা তাঁর কাছেই ফিরে যাবে।’ (সুরা আনজাম, আয়াত ৩৬)

‘তিনিই নিষ্প্রাণ থেকে প্রাণের উন্মেষ ঘটান আবার প্রাণকে করেন নিষ্প্রাণ। ধূসর জমিনকে তিনিই সজীব করে তোলেন। এমনিভাবে তোমাদেরও মৃত অবস্থা থেকে পুনরুত্থিত করা হবে।’ (সূরা রুম, আয়াত ১৯)

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। জন্ম হচ্ছে মৃত্যুর সংবাদদাতা। আর জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। পবিত্র কোরআনের সূরা আম্বিয়ার ৩৫ নং আয়াতে আছে, ‘জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে’। এ আয়াতে ‘নফস’- বলে পৃথিবীর জীব বোঝানো হয়েছে। আর তাদের সবার মৃত্যু অপরিহার্য।

মানুষের জীবনের তিনটি স্তর জন্ম, মৃত্যু এবং পুনরুত্থান। প্রত্যেক ব্যক্তিকেই অনিবার্যভাবে এ তিনটি পর্যায় অতিক্রম করতে হবে। কারণ মানুষের মূল এবং সবার আদি পিতা হজরত আদম আলাইহিস সালামও সৃষ্টি হয়েছিলেন। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন এবং একদিন পুনরুত্থানও করবেন। এ বিষয়গুলো সম্পর্কে কোরআনুল কারিমের আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, মাটি থেকেই আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, আর আমি মাটিতেই তোমাদের ফিরিয়ে নেব এবং মাটি থেকেই তোমাদের পুনরায় বের করে আনা হবে। (সুরা ত্বাহা, আয়াত ৫৫)

মানুষকে যখন কবরে রাখা হয়, তখন দুইজন ফেরেশতা এসে তাকে বসাবে এবং তাকে জিজ্ঞাসা করবে- তোমার রব কে? তোমার দীন কি? তোমার নবী কে? এ তিনটি প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করবে লোকটির ভাগ্য। যদি লোকটি সঠিক উত্তর- আমার রব আল্লাহ, আমার দীন ইসলাম এবং নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- দিতে পারে, তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করে বলবে, আমার বান্দা উত্তর সঠিক দিয়েছে, তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দাও। অতঃপর তার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হবে। জান্নাতের শীতল বাতাস ও সুঘ্রাণ আসতে থাকবে। সে জান্নাতের বড় বড় প্রাসাদ দেখতে পাবে এবং বলবে হে রব! তুমি কিয়ামত কায়েম কর, যাতে আমি আমার পরিবার পরিজনের নিকট ফিরে যেতে পারি।

আর যখন লোকটি তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। তখন সে বলবে, হায়! আমি কিছুই জানি না। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে সে বলবে, হায়! আমি কিছুই জানি না। আমি লোকদের এ ধরনের কথা বলতে শুনেছি। লোকটি দুনিয়াতে ঈমান আনে নি, দীনের আনুগত্য করে নি। সে দুনিয়াতে অন্ধ-অনুকরণ করত। অথবা দুনিয়ার ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ঈমান প্রকাশ করত আর অন্তরে কুফরকে লুকিয়ে রাখত। তখন কবরে লোকটি বলবে আমি দুনিয়াতে কতক লোককে এ ধরনের কিছু কথা বলতে শুনেছি তাই আমিও তা বলেছি। তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করে বলবে- আমার বান্দা মিথ্যা কথা বলছে। তোমরা তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও। তখন জাহান্নামে তার অবস্থান দেখতে পাবে এবং বলবে হে রব! তুমি কিয়ামত কায়েম করো না।

মহান আল্লাহ হযরত আদম (আলাইহিস্ সালাম)কে সৃষ্টি করার পর আদম (আলাইহিস সালাম)- এর পৃষ্ঠদেশ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সমস্ত বংশধরদের রূহ সৃষ্টি করলেন এবং তাদের জ্ঞান ও বাকশক্তি দিয়ে আল্লাহ তায়ালা রুবুবিয়্যাত তথা আল্লাহ তায়ালাই একমাত্র রব (প্রভু)-এ কথার স্বীকৃতি এভাবে নিয়েছেন ‘আলাস্তু বি রাব্বিকুম’ অর্থ্যাৎ ‘আমি কি তোমাদের প্রভু নই’? সমস্ত রূহেরা জবাব দিল, ‘বালা’ হা’ অবশ্যই। এ আলমে আরওয়াহ তথা রূহের জগতের স্বীকৃতি থেকে মানব জাতির প্রথম সফর শুরু হয়। ‘আলাস্তু’ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির এটাই সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ।

মৃত্যুর পর মানুষের কিয়ামত শুরু হয়ে যায়। মৃত্যুর পর কোন মানুষ আর দুনিয়াতে ফেরত আসে না। পবিত্র কোরআন ও হাদীস শরীফে মৃত্যুর কষ্ট ও ভয়াবহতা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা আছে।

মহানবী সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আমার উম্মতের হায়াত ৬০ থেকে ৭০ বছরের মাঝে’ (তিরমিযী)। বস্তুত: দুনিয়ার জীবন আখেরাতের তুলনায় একেবারেই সংকীর্ণ। আর আখেরাতের জীবন অনন্ত, অসীম ও চিরন্তন। কেয়ামতের দিন সীমাহীন কঠিন অবস্থার মধ্যেও সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়াপ্রাপ্ত হবেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ সাত শ্রেণির মানুষকে হাশরের দিন তার আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। যে দিন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া থাকবে না।

তারা হলেন: ১. ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ, ২. ওই যুবক, যে নিজের যৌবনকে আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেছে, ৩. ওই ব্যক্তি, যার অন্তর সর্বদা মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে ৪. আর ওই দুই ব্যক্তি, যারা পরস্পরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসে, উভয়ে তারই সন্তুষ্টির জন্য একত্র হয় এবং তারই সন্তুষ্টির জন্য পৃথক হয়, ৫. আর যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, আর তার দুই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে, ৬. ওই ব্যক্তি, যাকে কোনো সম্ভ্রান্ত ও সুন্দরী নারী কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার প্রস্তাব দেয়, আর তখন সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি এবং ৭. ওই ব্যক্তি, যে এমন গোপনতার সঙ্গে দান-সদকা করে, তার বাঁ হাতও জানে না তার ডান হাত কী দান করে। (বুখারি, হাদিস নং: ১৭৪; মুসলিম, হাদিস নং : ১৭১২)

কেয়ামতের মাঠে ঈমানদারদের চেহারা হবে উজ্জ্বল এবং তারা হবে সফলকাম। আর পাপীদের চেহারা হবে কালো, কুৎসিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অপরাধীরা সেদিন নিজ নিজ চেহারা দ্বারাই চিহ্নিত হয়ে যাবে এবং তাদের কপালের চুল ও পা ধরে টেনে-হিঁচড়ে নেওয়া হবে। ’ (সুরা আর-রাহমান, আয়াত ৪১)

কেয়ামতের মাঠে সব প্রাণীকে দুনিয়ার প্রতিশোধ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। অতঃপর জীবজন্তুকে বলা হবে—মাটি হয়ে যাও। তখন সবাই মাটি হয়ে যাবে। আর পাপীরা যখন সামনে কঠিন বিপদ-মুছিবত দেখবে, তখন বলবে—হায়! যদি আমি মাটি হয়ে যেতাম, তাহলে অনেক ভালো হতো।

আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে এবং ক্বিয়ামতের দিন তোমরা পূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। অতঃপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে ব্যক্তি সফলকাম হবে। বস্ত্ততঃ পার্থিব জীবন প্রতারণার বস্ত্ত ছাড়া কিছুই নয়’ (আল ইমরান ৩/১৮৫)।

আল্লাহ বলেন, আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ মরতে পারে না। সেজন্য একটা নির্ধারিত সময় রয়েছে…’ (আল ইমরান ৩/১৪৫)। তিনি বলেন, আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কি উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন মাটিতে তার মৃত্যু হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত’ (লোকমান ৩১/৩৪)। তিনি আরও বলেন, ‘…অতঃপর যখন সেই সময়কাল এসে যায়, তখন তারা সেখান থেকে এক মুহূর্ত আগপিছ করতে পারে না’ (নাহল ১৬/৬১)।

পৃথিবীর সব প্রাণীকেই এই মৃত্যুভয় তাড়িত করে। মানুষের মধ্যে শুধু প্রকৃত মুমিনরা এর ব্যতিক্রম। প্রভুর পরম সান্নিধ্য অর্জনে মৃত্যুই তাদের জন্য একমাত্র বাধা।

ঈমান মুমিনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। যে আল্লাহর ওপর ঈমান আনে এবং এর ওপর অবিচল থাকে মৃত্যুর সময় তার কোনো যন্ত্রণা থাকে না; বরং তার শেষ পরিণাম শুভ হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ অতঃপর অবিচল থাকে, (মৃত্যুর সময়) তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না। তারাই জান্নাতের অধিকারী! তারা তথায় চিরকাল থাকবে। তারা যে কর্ম করত, এটা তারই প্রতিফল। ’ (সুরা : আহকাফ, আয়াত : ১৩-১৪)

কোনো মুমিনের শেষ পরিণাম ভালো হওয়ার আলামত হলো, মৃত্যুর আগেই যাবতীয় পাপ থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা এবং সৎকাজ ও আল্লাহর আনুগত্যের তাওফিকপ্রাপ্ত হওয়া।

বিখ্যাত সাহাবি মুআজ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তির শেষ কথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হবে (অর্থাৎ এই কলেমা পড়তে পড়তে যার মৃত্যু হবে), সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২২০৩৪)। মৃত্যুযন্ত্রণা লাঘবে অধিক পরিমাণে এই কলেমা পাঠের বিকল্প নেই।

যারা ফরজ ও সুন্নত নামাজের প্রতি যত্নশীল হবে মহান আল্লাহ তাদের মৃত্যুযন্ত্রণা সহজ করবেন এবং জান্নাতে তাদের বিশেষ স্থান দেবেন। নবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সংরক্ষণ করবে তথা যথাযথভাবে অজু করে যথা সময়ে উত্তমরূপে রুকু-সিজদা করে নামাজ আদায় করবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেবেন। (মুসনাদে আহমদ : ৪/২৬৭)

মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করার বড় একটি উপকার হচ্ছে, অন্তর থেকে দুনিয়ার আসক্তি দূর হয় এবং পরকালের চিন্তা সৃষ্টি হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সব ভোগ-উপভোগ বিনাশকারী মৃত্যুকে তোমরা বেশি বেশি স্মরণ করো। (তিরমিজি, হাদিস ২৩০৭)

আল্লাহতায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ; আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০২)

প্রকৃত ঈমানদারগণ সর্বদা আল্লাহর দর্শন কামনা করেন। সেকারণ দুনিয়ার চাইতে আখেরাত তাদের নিকট সর্বাধিক কাম্য। তাই মৃত্যুর পর্দা উন্মোচিত হলেই সে দেখতে পায় এক আনন্দময় জগত। অতঃপর জান্নাতে যখন সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ স্বীয় নূরের পর্দা সরিয়ে দিয়ে স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করবেন ও সে তাঁর দিকে তাকাবে, তখন সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে। এর চাইতে আনন্দঘন মুহূর্ত তার জন্য আর হবে না। সেদিন আল্লাহকে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে রাত্রির মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায়।

মৃত্যু কখন ঘটবে তা জানা নেই, তাই সর্বক্ষণ আল্লাহতায়ালার বাধ্য ও অনুগত হয়ে চললেই আত্মসমপর্ণকারীরূপে মৃত্যু লাভের আশা করা যায়।

মৃত্যু চিন্তার ফলে লোভ-লালসা, অহংকার, আত্মম্ভরিতা, হিংসা বিদ্বেষ প্রভৃতি অসৎগুণ অপনীত হয়ে ব্যক্তির মাঝে সুকুমার গুণাবলী ও উন্নত মানবিক চরিত্রের বিকাশ ঘটে। মৃত্যু চিন্তা আত্মশুদ্ধি অর্জনের এক মহৌষধ যা আল্লাহভীরুতা আনয়ন করে ও ঈমান বৃদ্ধি করে।

ট্যাগ :
লেখকের পরিচিতি

জনপ্রিয় সংবাদ

রোড মার্চ সফল করার লক্ষ্যে নাঙ্গলকোটে বিএনপির গনমিছিল ও সমাবেশ

মৃত্যুর চিন্তা আল্লাহভীরুতা আনয়ন করে ও ঈমান বৃদ্ধি করে

আপডেট সময় : ০৯:৫৩:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ মে ২০২৩

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। যিনি সমস্ত বিশ্বজগতের সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, লালনকর্তা ও পালনকর্তা। আল্লাহ সমুদয় বস্তুর মালিক ও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। সত্তা, স্বকীয়তা, গুণ, কর্ম ও ক্ষমতায় তাঁর সমপর্যায়ের কেউই নেই, তিনি লা শরিক। দৃশ্য ও অদৃশ্য জগতের সব কিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই মানবকে জীবন দিয়েছেন; মরণও তাঁরই ইচ্ছাধীন। তিনিই জীবন ও মরণের মালিক। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, প্রাচুর্যময় তিনি (আল্লাহ) যাঁর হাতে রাজ্যের ক্ষমতা, তিনি সব বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান। যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে পরীক্ষা করবেন তোমাদের, কে তোমাদের কর্মে উত্তম। তিনি পরাক্রমশালী স্নেহশীল ক্ষমায়। (সুরা মুলক, আয়াত ১-২)

প্রত্যেক প্রাণী মাত্রই মরণশীল। জন্ম ও মৃত্যু অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। দুটির কোনটির ক্ষমতা মানুষের হাতে নেই। আল্লাহর হুকুমেই জন্ম হয়। আল্লাহর হুকুমেই মৃত্যু হয়। কখন হবে, কোথায় হবে, কিভাবে হবে, তা কারো জানা নেই। আল্লাহর হাতেই সবকিছু, যিনি জীবন দান করেছেন। অতঃপর জীবনদাতার সামনে হাজিরা দিয়ে জীবনের পূর্ণ হিসাব পেশ করতে হবে। হিসাব শেষে জান্নাত বা জাহান্নাম নির্ধারিত হবে ও সেখানেই চিরকাল শান্তিতে বাস করবে অথবা শাস্তি ভোগ করবে।

আল্লাহতায়ালা বলেন, প্রতিটি প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে। মহাবিচার দিবসে তোমাদের সবাইকে কর্মফল পুরোপুরিই দেয়া হবে। সফল মানুষ হবে সে-ই, যাকে লেলিহান আগুন থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে দাখিল করা হবে। আর শুধু পার্থিব জীবন তো এক মরীচিকাপূর্ণ ভোগ-বিভ্রম ছাড়া কিছুই নয়।’ (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৮৫)

আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা কীভাবে আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার কর? অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন। তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন ও পুনরায় জীবন্ত করবেন। পরিণামে তার দিকেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে। তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং তাকে সপ্ত আকাশে বিন্যস্ত করেন। তিনি সর্ববিষয়ে সবিশেষ অবগত। (সুরা বাকারা, আয়াত ২৮-২৯)

পবিত্র কোরআন শতাব্দীর পর শতাব্দী জীবন ও জগৎ সম্পর্কে কোটি কোটি মানুষের অন্তর্দৃষ্টি খুলে দিয়েছে, বদলে দিয়েছে ভেতর থেকে, খুলে দিয়েছে তাদের সম্ভাবনার দ্বার, দিয়েছে প্রশান্ত ও পরিতৃপ্ত জীবন। এই জীবনের সঙ্গে মৃত্যুও যে জড়িত তাও আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহই তোমাদের জীবন দান করেছেন। তিনিই তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন। আবার তিনিই তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করবেন। তারপরও মানুষ অতি-অকৃতজ্ঞ! (সুরা হজ, আয়াত ৬৬)

নিশ্চয়ই কখন কেয়ামত হবে তা শুধু আল্লাহই জানেন। তিনি মেঘ থেকে বৃষ্টিবর্ষণ করেন। তিনি জানেন জরায়ুতে কী আছে। অথচ কেউই জানে না আগামীকাল তার জন্যে কী অপেক্ষা করছে এবং কেউ জানে না কোথায় তার মৃত্যু হবে। শুধু আল্লাহই সর্বজ্ঞ, সব বিষয়ে অবহিত।’ (সূরা লোকমান, আয়াত ৩৪)

দূরাচারীরা কি মনে করে যে, তাদের জীবন ও মৃত্যু এবং বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীলদের জীবন ও মৃত্যু একইরকম হবে? কত ভ্রান্ত ধারণা ওদের! (সুরা জাসিয়া, আয়াত ২১)

নিশ্চয়ই মৃত্যুর সময় নির্ধারিত। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো মৃত্যু হতে পারে না। কেউ পার্থিব পুরস্কারের জন্যে কাজ করলে তাকে তার পুরস্কার ইহকালে দান করবো। আর যদি কেউ পরকালের জন্যে কাজ করে তবে তার পুরস্কার সে পরকালে পাবে। শোকরগোজার বান্দাদের কাজের ফল আমি নিশ্চয়ই দেবো। (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৪৫)

সত্যের পথে তোমরা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করো বা নিহত হও, তোমরা আল্লাহর কাছেই সমবেত হবে। (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৫৮)

‘হে নবী! তোমার পূর্বেও আমি কোনো মানুষকে অমরত্ব দান করিনি। তোমার মৃত্যু হলে ওরা কি চিরকাল বেঁচে থাকবে?’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত ৩৪)

‘প্রত্যেক প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আমি তোমাদের ভালো ও খারাপ অবস্থা দিয়ে পরীক্ষা করি। আর আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসতে হবে।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত ৩৫)

‘আল্লাহ মৃত্যু এলে বা ঘুমের সময় আত্মাকে তুলে নেন। তারপর যার মৃত্যু অবধারিত তার আত্মা রেখে দেন। আর অন্যদের আত্মা নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ফিরিয়ে দেন। সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগকারীদের জন্যে এর মধ্যে শিক্ষণীয় নিদর্শন রয়েছে!’ (সুরা জুমার, আয়াত ৪২)

‘হে মানুষ! আমিই জীবন দান করি। আমিই মৃত্যু ঘটাই। আমার কাছেই সবাইকে ফিরে আসতে হবে। যেদিন জমিন বিদীর্ণ হবে এবং মৃত্যুরা উত্থিত হয়ে ছুটতে থাকবে, তখন তাদের সমবেত করা খুব সহজ একটি কাজ।’ (সুরা কাফ, আয়াত ৪৩-৪৪)

‘আমি বিধান দিয়েছি যে, মৃত্যু সব সময় তোমাদের মাঝে অবস্থান করবে। আর তোমাদের অস্তিত্বের প্রকৃতি পরিবর্তন বা তোমাদের জানা নেই, এমন আকৃতিতে তোমাদের সৃষ্টি করা থেকে আমাকে বিরত রাখার শক্তি কারো নেই।’ (সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত ৬০-৬১)

‘হে নবী ওদের বলুন, যে মৃত্যু থেকে তোমরা পালাতে চাচ্ছ, তোমাদেরকে সে মৃত্যুর মুখোমুখি হতেই হবে। শেষ পর্যন্ত তোমাদেরকে হাজির করা হবে দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর কাছে। জীবদ্দশায় যা করেছ, তা তোমরা তখন পুরোপুরি জানতে ও উপলব্ধি করতে পারবে।’ (সুরা জুমআ, আয়াত ৮)

‘সারাজীবন অন্যায় করে মৃত্যু শয্যায় এসে যারা বলে, আমি তওবা করলাম, তাদের তওবা কোন কাজে আসবে না। আর সত্য অস্বীকারকারী হিসেবেই যারা মৃত্যুবরণ করে, তাদের জন্যেও তওবা নয়। তাদের জন্যে আমি নিদারুণ শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছি।’ (সুরা নিসা, আয়াত ১৮)

‘যারা মুক্তমন নিয়ে শোনে, তারাই সত্যের ডাকে সাড়া দেয়। মহাবিচার দিবসে আল্লাহ মৃতদের পুনর্জীবিত করবেন। তারপর তারা তাঁর কাছেই ফিরে যাবে।’ (সুরা আনজাম, আয়াত ৩৬)

‘তিনিই নিষ্প্রাণ থেকে প্রাণের উন্মেষ ঘটান আবার প্রাণকে করেন নিষ্প্রাণ। ধূসর জমিনকে তিনিই সজীব করে তোলেন। এমনিভাবে তোমাদেরও মৃত অবস্থা থেকে পুনরুত্থিত করা হবে।’ (সূরা রুম, আয়াত ১৯)

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। জন্ম হচ্ছে মৃত্যুর সংবাদদাতা। আর জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। পবিত্র কোরআনের সূরা আম্বিয়ার ৩৫ নং আয়াতে আছে, ‘জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে’। এ আয়াতে ‘নফস’- বলে পৃথিবীর জীব বোঝানো হয়েছে। আর তাদের সবার মৃত্যু অপরিহার্য।

মানুষের জীবনের তিনটি স্তর জন্ম, মৃত্যু এবং পুনরুত্থান। প্রত্যেক ব্যক্তিকেই অনিবার্যভাবে এ তিনটি পর্যায় অতিক্রম করতে হবে। কারণ মানুষের মূল এবং সবার আদি পিতা হজরত আদম আলাইহিস সালামও সৃষ্টি হয়েছিলেন। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন এবং একদিন পুনরুত্থানও করবেন। এ বিষয়গুলো সম্পর্কে কোরআনুল কারিমের আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, মাটি থেকেই আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, আর আমি মাটিতেই তোমাদের ফিরিয়ে নেব এবং মাটি থেকেই তোমাদের পুনরায় বের করে আনা হবে। (সুরা ত্বাহা, আয়াত ৫৫)

মানুষকে যখন কবরে রাখা হয়, তখন দুইজন ফেরেশতা এসে তাকে বসাবে এবং তাকে জিজ্ঞাসা করবে- তোমার রব কে? তোমার দীন কি? তোমার নবী কে? এ তিনটি প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করবে লোকটির ভাগ্য। যদি লোকটি সঠিক উত্তর- আমার রব আল্লাহ, আমার দীন ইসলাম এবং নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- দিতে পারে, তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করে বলবে, আমার বান্দা উত্তর সঠিক দিয়েছে, তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দাও। অতঃপর তার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হবে। জান্নাতের শীতল বাতাস ও সুঘ্রাণ আসতে থাকবে। সে জান্নাতের বড় বড় প্রাসাদ দেখতে পাবে এবং বলবে হে রব! তুমি কিয়ামত কায়েম কর, যাতে আমি আমার পরিবার পরিজনের নিকট ফিরে যেতে পারি।

আর যখন লোকটি তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। তখন সে বলবে, হায়! আমি কিছুই জানি না। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে সে বলবে, হায়! আমি কিছুই জানি না। আমি লোকদের এ ধরনের কথা বলতে শুনেছি। লোকটি দুনিয়াতে ঈমান আনে নি, দীনের আনুগত্য করে নি। সে দুনিয়াতে অন্ধ-অনুকরণ করত। অথবা দুনিয়ার ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ঈমান প্রকাশ করত আর অন্তরে কুফরকে লুকিয়ে রাখত। তখন কবরে লোকটি বলবে আমি দুনিয়াতে কতক লোককে এ ধরনের কিছু কথা বলতে শুনেছি তাই আমিও তা বলেছি। তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করে বলবে- আমার বান্দা মিথ্যা কথা বলছে। তোমরা তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও। তখন জাহান্নামে তার অবস্থান দেখতে পাবে এবং বলবে হে রব! তুমি কিয়ামত কায়েম করো না।

মহান আল্লাহ হযরত আদম (আলাইহিস্ সালাম)কে সৃষ্টি করার পর আদম (আলাইহিস সালাম)- এর পৃষ্ঠদেশ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সমস্ত বংশধরদের রূহ সৃষ্টি করলেন এবং তাদের জ্ঞান ও বাকশক্তি দিয়ে আল্লাহ তায়ালা রুবুবিয়্যাত তথা আল্লাহ তায়ালাই একমাত্র রব (প্রভু)-এ কথার স্বীকৃতি এভাবে নিয়েছেন ‘আলাস্তু বি রাব্বিকুম’ অর্থ্যাৎ ‘আমি কি তোমাদের প্রভু নই’? সমস্ত রূহেরা জবাব দিল, ‘বালা’ হা’ অবশ্যই। এ আলমে আরওয়াহ তথা রূহের জগতের স্বীকৃতি থেকে মানব জাতির প্রথম সফর শুরু হয়। ‘আলাস্তু’ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির এটাই সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ।

মৃত্যুর পর মানুষের কিয়ামত শুরু হয়ে যায়। মৃত্যুর পর কোন মানুষ আর দুনিয়াতে ফেরত আসে না। পবিত্র কোরআন ও হাদীস শরীফে মৃত্যুর কষ্ট ও ভয়াবহতা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা আছে।

মহানবী সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আমার উম্মতের হায়াত ৬০ থেকে ৭০ বছরের মাঝে’ (তিরমিযী)। বস্তুত: দুনিয়ার জীবন আখেরাতের তুলনায় একেবারেই সংকীর্ণ। আর আখেরাতের জীবন অনন্ত, অসীম ও চিরন্তন। কেয়ামতের দিন সীমাহীন কঠিন অবস্থার মধ্যেও সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়াপ্রাপ্ত হবেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ সাত শ্রেণির মানুষকে হাশরের দিন তার আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। যে দিন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া থাকবে না।

তারা হলেন: ১. ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ, ২. ওই যুবক, যে নিজের যৌবনকে আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেছে, ৩. ওই ব্যক্তি, যার অন্তর সর্বদা মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে ৪. আর ওই দুই ব্যক্তি, যারা পরস্পরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসে, উভয়ে তারই সন্তুষ্টির জন্য একত্র হয় এবং তারই সন্তুষ্টির জন্য পৃথক হয়, ৫. আর যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, আর তার দুই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে, ৬. ওই ব্যক্তি, যাকে কোনো সম্ভ্রান্ত ও সুন্দরী নারী কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার প্রস্তাব দেয়, আর তখন সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি এবং ৭. ওই ব্যক্তি, যে এমন গোপনতার সঙ্গে দান-সদকা করে, তার বাঁ হাতও জানে না তার ডান হাত কী দান করে। (বুখারি, হাদিস নং: ১৭৪; মুসলিম, হাদিস নং : ১৭১২)

কেয়ামতের মাঠে ঈমানদারদের চেহারা হবে উজ্জ্বল এবং তারা হবে সফলকাম। আর পাপীদের চেহারা হবে কালো, কুৎসিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অপরাধীরা সেদিন নিজ নিজ চেহারা দ্বারাই চিহ্নিত হয়ে যাবে এবং তাদের কপালের চুল ও পা ধরে টেনে-হিঁচড়ে নেওয়া হবে। ’ (সুরা আর-রাহমান, আয়াত ৪১)

কেয়ামতের মাঠে সব প্রাণীকে দুনিয়ার প্রতিশোধ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। অতঃপর জীবজন্তুকে বলা হবে—মাটি হয়ে যাও। তখন সবাই মাটি হয়ে যাবে। আর পাপীরা যখন সামনে কঠিন বিপদ-মুছিবত দেখবে, তখন বলবে—হায়! যদি আমি মাটি হয়ে যেতাম, তাহলে অনেক ভালো হতো।

আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে এবং ক্বিয়ামতের দিন তোমরা পূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। অতঃপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে ব্যক্তি সফলকাম হবে। বস্ত্ততঃ পার্থিব জীবন প্রতারণার বস্ত্ত ছাড়া কিছুই নয়’ (আল ইমরান ৩/১৮৫)।

আল্লাহ বলেন, আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ মরতে পারে না। সেজন্য একটা নির্ধারিত সময় রয়েছে…’ (আল ইমরান ৩/১৪৫)। তিনি বলেন, আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কি উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন মাটিতে তার মৃত্যু হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত’ (লোকমান ৩১/৩৪)। তিনি আরও বলেন, ‘…অতঃপর যখন সেই সময়কাল এসে যায়, তখন তারা সেখান থেকে এক মুহূর্ত আগপিছ করতে পারে না’ (নাহল ১৬/৬১)।

পৃথিবীর সব প্রাণীকেই এই মৃত্যুভয় তাড়িত করে। মানুষের মধ্যে শুধু প্রকৃত মুমিনরা এর ব্যতিক্রম। প্রভুর পরম সান্নিধ্য অর্জনে মৃত্যুই তাদের জন্য একমাত্র বাধা।

ঈমান মুমিনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। যে আল্লাহর ওপর ঈমান আনে এবং এর ওপর অবিচল থাকে মৃত্যুর সময় তার কোনো যন্ত্রণা থাকে না; বরং তার শেষ পরিণাম শুভ হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ অতঃপর অবিচল থাকে, (মৃত্যুর সময়) তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না। তারাই জান্নাতের অধিকারী! তারা তথায় চিরকাল থাকবে। তারা যে কর্ম করত, এটা তারই প্রতিফল। ’ (সুরা : আহকাফ, আয়াত : ১৩-১৪)

কোনো মুমিনের শেষ পরিণাম ভালো হওয়ার আলামত হলো, মৃত্যুর আগেই যাবতীয় পাপ থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা এবং সৎকাজ ও আল্লাহর আনুগত্যের তাওফিকপ্রাপ্ত হওয়া।

বিখ্যাত সাহাবি মুআজ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তির শেষ কথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হবে (অর্থাৎ এই কলেমা পড়তে পড়তে যার মৃত্যু হবে), সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২২০৩৪)। মৃত্যুযন্ত্রণা লাঘবে অধিক পরিমাণে এই কলেমা পাঠের বিকল্প নেই।

যারা ফরজ ও সুন্নত নামাজের প্রতি যত্নশীল হবে মহান আল্লাহ তাদের মৃত্যুযন্ত্রণা সহজ করবেন এবং জান্নাতে তাদের বিশেষ স্থান দেবেন। নবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সংরক্ষণ করবে তথা যথাযথভাবে অজু করে যথা সময়ে উত্তমরূপে রুকু-সিজদা করে নামাজ আদায় করবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেবেন। (মুসনাদে আহমদ : ৪/২৬৭)

মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করার বড় একটি উপকার হচ্ছে, অন্তর থেকে দুনিয়ার আসক্তি দূর হয় এবং পরকালের চিন্তা সৃষ্টি হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সব ভোগ-উপভোগ বিনাশকারী মৃত্যুকে তোমরা বেশি বেশি স্মরণ করো। (তিরমিজি, হাদিস ২৩০৭)

আল্লাহতায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ; আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০২)

প্রকৃত ঈমানদারগণ সর্বদা আল্লাহর দর্শন কামনা করেন। সেকারণ দুনিয়ার চাইতে আখেরাত তাদের নিকট সর্বাধিক কাম্য। তাই মৃত্যুর পর্দা উন্মোচিত হলেই সে দেখতে পায় এক আনন্দময় জগত। অতঃপর জান্নাতে যখন সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ স্বীয় নূরের পর্দা সরিয়ে দিয়ে স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করবেন ও সে তাঁর দিকে তাকাবে, তখন সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে। এর চাইতে আনন্দঘন মুহূর্ত তার জন্য আর হবে না। সেদিন আল্লাহকে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে রাত্রির মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায়।

মৃত্যু কখন ঘটবে তা জানা নেই, তাই সর্বক্ষণ আল্লাহতায়ালার বাধ্য ও অনুগত হয়ে চললেই আত্মসমপর্ণকারীরূপে মৃত্যু লাভের আশা করা যায়।

মৃত্যু চিন্তার ফলে লোভ-লালসা, অহংকার, আত্মম্ভরিতা, হিংসা বিদ্বেষ প্রভৃতি অসৎগুণ অপনীত হয়ে ব্যক্তির মাঝে সুকুমার গুণাবলী ও উন্নত মানবিক চরিত্রের বিকাশ ঘটে। মৃত্যু চিন্তা আত্মশুদ্ধি অর্জনের এক মহৌষধ যা আল্লাহভীরুতা আনয়ন করে ও ঈমান বৃদ্ধি করে।